ব্লাক হোল অথবা কৃষ্ণগহ্বর শব্দটির সাথে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত। মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় এবং লোমহর্ষক একটি নাম এই “Black Hole“।
Black Hole সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা প্রায় সবারই আছে।এর গ্রেভিটেশনাল ফোর্স এত বেশি যে এর ইভেন্ট হরাইজনের আশেপাশে অবস্থান করা যেকোনো আকার,আকৃতি,প্রকৃতির বস্তুকে নিজের দিকে টেনে নেয়।এমনকি আলোর কণারও এর হাত থেকে নিস্তার নেই। যে কারণে Black Hole সম্পূর্ণরূপে কালো অন্ধকার।
আমার আলোচনার বিষয় হলো “কী ঘটবে আপনার সাথে যদি আপনি Black Hole এ পতিত হোন?”
এটা কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু নয়।বর্তমান বিশ্ব যে পরিমাণে অজানাকে জানার চেষ্টা চালানো হচ্ছে,কয়েক যুগ পরেই মানুষ হয়তো আরো দূরের কোনো বাসযোগ্য গ্রহ আবিষ্কারের লক্ষ্যে রওনা হবে এবং তাদের স্পেসশিপটি কোনো এক অজানা Black Hole এর ইভেন্ট হরাইজনে পতিত হলো।এবার ঠিক কী ঘটবে তাদের সাথে?
স্বাভাবিক ভাবে Black Hole এ পতিত হওয়ার একমাত্র পরিণাম মৃত্যু এবং ভয়ংকর মৃত্যু।
প্রথমেই বলা হয়েছে ইভেন্ট হরাইজনের আশেপাশে কোনো বস্তু গেলেই তাকে Black Hole নিজের দিকে টেনে নেয়।এক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না।প্রচন্ড গতিবেগে Black Hole আপনাকে নিজের দিকে টেনে নেবে।এই টেনে নেওয়ার শক্তি এত বেশি যে আপনার পা সামনে এবং মাথা পেছনে থাকলে পায়ের ক্ষেত্রে গ্রেভিটেশনাল ফোর্স বেশি হওয়ায় আপনার পা দুটো লম্বা হয়ে সামনে যেতে থাকবে।যাকে মূলত Spaghettification বলা হয়।ঠিক যেভাবে চুইংগামের একাংশকে টানলে লম্বা হয়ে চলে আসতে থাকে।এরপর আপনি প্রচন্ড বেগে Black Hole এর কেন্দ্রের দিকে যেতে থাকবেন।
Black Hole এর কেন্দ্রে অনেককিছুই ঘটতে পারে।
ব্ল্যাক হোলের প্রকারভেদ
ব্ল্যাক হোল বিভিন্ন রকম হতে পারে। কোন কোন ব্ল্যাক হোল আকারে অনেক বড়, আবার কোন কোন টি তুলনামূলক অনেক ছোট। ভরের দিকেও রয়েছে বিভিন্নতা। বিজ্ঞানীদের মতে ক্ষুদ্রতম ব্ল্যাক হোল একটি পরমাণুর সমানও হতে পারে। প্রধানত নিম্নোক্ত চার প্রকারের ব্ল্যকহোলের কথা জানা যায়;
১. মাইক্রো বা মিনি ব্ল্যাক হোল (Micro Black hole)
২. স্টেলার ব্ল্যাক হোল (Stella Blackhole)
৩. ইন্টারমিডিয়েট ব্ল্যাক হোল (Intermediate Blackhole)
৪. সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল (Super Massive Blackhole)
মাইক্রো বা মিনি ব্ল্যাক হোল (Micro Blackhole): এই জাতীয় ব্ল্যাক হোল গুলো আকারে অনেক ক্ষুদ্র। তবে এদের ভর কিন্তু মোটেও কম নয়। এদের ভর একটি পর্বতের সমানও হতে পারে। এই ধরনের ব্ল্যাক হোলকে বলা হয় Micro Blackhole। এ ধরনের ব্ল্যাক হোল সম্পূর্নই তাত্ত্বিক। যে সকল বস্তুর ভর আমাদের সূর্যের ভরের চেয়েও কম তাদের যদি ব্ল্যাক হোলে পরিণত করা যায় তবে তারা মাইক্রো ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে। এদের আকার একটি পরমাণুর সমানও হতে পারে। এই ধরনের ব্ল্যাক হোলকে Primordial Black Hole ও বলা হয়। এই ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে আমরা যা জানি তার পুরাটাই থিওরিটিক্যাল বা তত্ত্বীয়। বাস্তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এখনও এই ধরনের ব্ল্যাক হোল দেখতে পারেন নি। গাণিতিকভাবে চিন্তা করলে সবকিছুই ব্ল্যাক হোলের পরিণত হতে পারে। প্রত্যেক নির্দিষ্ট ভরের বস্তুর জন্য একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধ আছে যে ব্যাসার্ধে বস্তুটি ব্ল্যাক হোল পরিণত হতে পারে। পূর্বেই যেটিকে শোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
স্টেলার ব্লাকহোল (Stella Black hole): এটি বিশ্বাস করা হয় যে স্টেলার ব্ল্যাক হোল গুলি দুটি ভিন্ন উপায়ে গঠিত হতে পারে; হয় একটি বৃহত্তর নক্ষত্র সুপারনোভা বিস্ফোরণ ছাড়াই সরাসরি ব্ল্যকহোলে পতিত হয়ে বা প্রোটো-নিউট্রন নক্ষত্রের মধ্যে একটি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে। ৫ সৌর ভর থেকে শুরু করে ১০০ সৌর ভর পর্যন্ত নক্ষত্র গুলো সাধারনত স্টেলার ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ধারণা করা হয় যে, একটি নক্ষত্রের জীবনকালের শেষে নক্ষত্রটি যদি যথেষ্ট বড় (আমাদের সূর্যের ভরের ৩ গুণের বেশি) হয় তাহলে সেটা সুপারনোভার মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়ে স্টেলার ব্লাকহোলে পরিণত হয়। Harvard-Smithsonian Center for Astrophysics এর মতে মিল্কিওয়েতে কয়েকশ মিলিয়ন স্টেলার ব্ল্যাক হোল রয়েছে।
ইন্টারমিডিয়েট ব্লাকহোল (Intermediate Black hole): একসময় ব্ল্যাক হোল বলতে শুধু স্টেলার ও সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলকেই বুঝানো হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা স্টেলার ও সুপার ম্যাসিভ এর মাঝামাঝি ভরের একধরনের ব্ল্যাক হোল খুঁজে পেয়েছেন। এই ধরনের ব্ল্যাক হোলকে বলা হয় ইন্টারমিডিয়েট ম্যাস ব্ল্যাক হোল (Intermediate Mass Black Hole)। ভরের তুলনায় এই ধরনের ব্ল্যাক হোল আমাদের সূর্যের থেকে ১০০ থেকে ১ লক্ষ্য গুন বড় হতে পারে। স্টেলার ব্ল্যাক হোলের মত এদের জন্মও হয় কোনো একটি বিপুল ভর বিশিষ্ট নক্ষত্রের মৃত্যু থেকে। ২০১৯ সালের ২১ মে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এন্ট্রেনায় একটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ধরা পড়ে। ৮৫ ও ৬৫ সৌরভোরের দুটি স্টেলার ব্ল্যাক হোলের মিলনে ১৪২ সৌরভরের একটি ইন্টারমিডিয়েট ব্ল্যাক হোল জন্মের সময় উৎপন্ন হয়েছিল ঐ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। ইন্টারমিডিয়েট ব্ল্যাক হোল খুঁজে পাওয়া অনেক কষ্ট সাধ্য ব্যাপার। ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে এই ধরনের ব্ল্যাক হোল ছোট গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও পাওয়া যায়। এই ধরনের ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে আমাদের এখনও অনেক জ্ঞানই অস্পষ্ট।
সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল (Supermassive Black hole): সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল গুলোর ব্যাসার্ধ কয়েক শত মিলিয়ন কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে. এদের ভর আমাদের সূর্যের ভরের তুলনায় কয়েক হাজার মিলিয়ন গুন বেশি হতে পারে। গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত কয়েকটি ইন্টারমিডিয়েট ব্ল্যাক হোল ঘটনাক্রমে একসাথে হয়ে একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলে রূপান্তরিত হতে পারে।
সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলগুলির ভর সাধারণত 0.1 থেকে 1 মিলিয়ন সৌরভরের চেয়ে বেশি হয়। অবশ্য কোন কোন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর মতে যাদের ভর কমপক্ষে 10 বিলিয়ন সৌরভর তাদের আল্ট্রাম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল বলে আখ্যায়িত করেন। বিজ্ঞানীদের মতে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের ভর সর্বাধিক ৫০ বিলিয়ন সৌরভর হতে পারে। আবার একটি ১ বিলিয়ন সৌরভরের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের ব্যাসার্ধ ইউরেনাস গ্রহের কক্ষপথের সেমি-মেজর অক্ষের সাথে তুলনীয়। সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের কিছু বৈশিষ্ট তাদেরকে নিম্ন-ভর বিশিষ্ট ব্ল্যাক হোল গুলি থেকে সম্পূর্ন আলাদা করেছে। এদের ঘটনা দিগন্তের আশেপাশের টাইডাল ফোর্স অপেক্ষাকৃত দুর্বল।
আবার ঘূর্ণনের ভিত্তিতে ব্ল্যাক হোল দুইভাগে ভাগ করা যায়:
১। ঘূর্ণণরত ব্ল্যাক হোল (Rotating or Spinning Black hole): এদের ঘূর্ণনরত ব্ল্যাক হোল বলা হয় কারণ এদের কৌণিক ঘূর্ণন রয়েছে। এরা পৃথিবী ও সুর্যের মত নিজ অক্ষরের ওপর ঘূর্ণনশীল। বস্তবজগতে সব ব্ল্যাক হোলই এই ধরনের।
২। ঘূর্ণনহীন ব্ল্যাক হোল (Non Rotating or Non Spinning Black hole): যে ব্ল্যাক হোল গুলো ঘূর্ণয়মন অবস্থায় থাকে না তাদের বলা হয় ঘূর্ণন হীন বা নন রোটেটিং ব্ল্যাক হোল। বাস্তব জগতে এদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এরা শুধু মাত্র তত্ত্বীয়।
ব্ল্যাক হোল কোথায় থাকে?
একটি ব্ল্যাক হোল কোন গ্যালাক্সির যে কোন স্থানে থাকতে পারে। স্টেলার ব্ল্যাকহলগুলি কোন গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। তবে প্রতিটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটি সুপাম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল থাকে। সম্পূর্ন গ্যালাক্সিটি এই সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের চারদিকে ঘুরতে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে একটি ছোট গ্যালাক্সির কেন্দ্রে ইন্টারমিডিয়েট ব্ল্যাক হোল থাকতে পারে। তবে বৃহৎ গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্রে সবসময় একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল থাকে।
আমাদের গ্যালাক্সিতে কী ব্ল্যাক হোল আছে?
হ্যাঁ, মিল্কিওয়ে মানে আমাদের গ্যালিক্সিতেও ব্ল্যাক হোল রয়েছে, তাও আবার কয়েক শত মিলিয়ন। Harvard-Smithsonian Center for Astrophysics এর একটি গবেষণা থেকে জানা যায় আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে কয়েক শত মিলিয়ন স্টেলার ব্লাকহোল রয়েছে। আবার নাসার তথ্যমতে আমাদের গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০ মিলিয়ন স্টেলার ব্ল্যাক হোল রয়েছে।
আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যে সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল রয়েছে তার নাম Sagittarius A*। এই ব্ল্যাক হোলকটির ভর আমাদের সূর্যের ভরের প্রায় ৪ মিলিয়ন গুন বেশি। বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের সৌরজগত থেকে এই ব্ল্যাক হোল টির দূরত্ব প্রায় ২৬০০০ আলোকবর্ষ। ২০১৯ সালে Paranal Space Observatory মিল্কিওয়ে থেকে প্রায় ৭০০ আলোকবর্ষ দূরে Holmberg 15A গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল খুঁজে পায়, যার ভর সূর্যের ভরের প্রায় ৪০ বিলিয়ন গুন বেশি এবং শোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ ১১৮.৩৫ বিলিয়ন কিলোমিটার যা পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যকার দূরত্বের ৮০০ গুন! এর নাম S50014+81।
ব্ল্যাক হোলের কি ধ্বংস আছে?
হ্যাঁ, ব্ল্যাক হোলেরও ধ্বংস আছে। ব্ল্যাক হোল ক্রমাগত বিকিরণ নির্গমন করে। ১৯৭৪ সালে বিখ্যাত পদার্থবজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এটি প্রমাণ করেন যে, ব্ল্যাক হোল থেকে ক্রমাগত কিছু বিকিরন নিঃসরণ হয়। তার নাম অনুসারে এই বিকিরন কে বলা হয় হলিং রেডিয়েশন (Hawking Radiation) ।
তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি শাখা কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের সহায়তায় এই বিকিরন ব্যাখ্যা করেছিলেন। কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের মতে মহাশূন্যের শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়। এই শূন্যস্থানে প্রতিনিয়ত ভার্চুয়াল কণারা জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি হচ্ছে এবং ধ্বংসও হচ্ছে। এদের মধ্যে একটি বাস্তব কণা (particle) অপরটি প্রতিকণা (anti-particle)। এই বস্তবকনা ও প্রতিকণা সৃষ্টি হবার খুব অল্প সময়ের মধ্যে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। এই ভার্চুয়াল কণা গুলো যখন ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের কাছে উৎপন্ন হয় তখন ব্ল্যাক হোলের অভিকর্ষ শক্তির প্রভাবে এই কনা গুলো মিলিত হতে পারে না। এদের মধ্যে একটিকে ব্ল্যাক হোল তার নিজের দিকে টেনে নেয় আর অপরটি বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। এই কণাটির বাইরের আসতে যে শক্তি লাগে তা ব্ল্যাক হোল নিজেই সরবরাহ করে। এই কণাটিকেই আমরা বিকিরণ আকারে ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্ত থেকে বের হতে দেখি। এই বিকিরণ কে বলা হয় হকিং বিকিরণ (Hawking Radiation) । এই বিকিরনের ফলে ধীরে ধীরে ব্ল্যাক হোলের শক্তি হ্রাস পেতে থাকে। তবে এটি খুবই ধীর প্রক্রিয়া। এভাবে বিকিরণ নির্গমনের ফলে ব্ল্যাক হোলের মৃত্যু ঘটে। ব্ল্যাক হোলের মৃত্যুর একটি বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে এর সমস্ত ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। একটি ব্ল্যাক হোলের মৃত্যু কখন ঘটবে সেটা নির্ভর করে এর ভরের ওপর। যার ভর যত বেশি হবে সেই ব্ল্যাক হোলটি মহাবিশ্বে তত বেশি কাল ধরে টিকে থাকবে। যেমন আইফেল টাওয়ারকে যদি ব্ল্যাক হোল এ পরিণত করা হয় তাহলে এটা মাত্র কয়েক সেকেন্ড টিকে থাকবে।
একটি ব্ল্যাক হোল এর জীবনকাল সর্বোচ্চ কত হতে পারে?
ব্ল্যাক হোল হকিং রেডিয়েশনের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। হকিং রেডিয়েশন একটি অতি ধীর প্রক্রিয়া। যে কারণে একটি ব্ল্যাক হোল অনেক দীর্ঘ সময় টিকে থাকে। সূর্যের ভরের সমান একটি ব্ল্যাক হোল ক্ষয় হতে প্রায় 10^67 বছর সময় নেয়। মিল্কিওয়ে কেন্দ্রের ব্ল্যাক হোলটির ক্ষয় হতে 10^87 বছর সময় লাগবে। আবার মহাবিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তর ব্ল্যাক হোল টি সময় নেবে প্রায় 10^100 বছর।
যেভাবে সম্ভব হয়েছিল ব্ল্যাক হোলের প্রথম চিত্র ধারন
টিভি, পত্রিকা সিনেমা বা অনলাইনে আমরা ব্ল্যাক হোলের যে ছবি দেখি তা সবই গ্রাফিক্স এর মাধ্যমে তৈরি। ২০১৯ সালের পূর্বে ব্ল্যাক হোল ছিল সম্পূর্নই গবেষনা নির্ভর। এর বাস্তব চিত্র আমাদের দেখা সম্ভব হয় নি। কিন্তু ১০ এপ্রিল, ২০১৯ তারিখে আমরা সর্বপ্রথম একটি ব্ল্যাক হোলের বাস্তব চিত্র দেখতে পাই। ত চলুন দেখে নেওয়া যাক কীভাবে সম্ভব হয়েছিল এই অসাধ্য সাধন।
মহাকাশে কখনো কখনো দুটি ব্ল্যাক হোল একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে আসে। এ অবস্থায় ব্ল্যাক হোল দুটি একে অন্যকে কেন্দ্র করে সর্পিলাকার পথে ঘুরতে থাকে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় ব্ল্যাক হোল দুটির পরস্পরের সাথে সংঘর্ষ হয়। আর এই সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বা Gravitational Wave। এই তরঙ্গ কে পৃথিবী থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র দিয়ে সনাক্ত করা সম্ভব। যেহেতু ব্ল্যাক হোল পুরোপুরি অন্ধকার, এই ঘটনাগুলি দূরবীণ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দ্বারা ব্যবহৃত অন্যান্য আলোক-সনাক্তকরণ যন্ত্রগুলির সাহায্যে সনাক্ত করা অসম্ভব।
আমরা জানি, বৃহৎ কোন নক্ষত্রের ধ্বংস হওয়ার মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের সৃষ্টি হয়। এ সময় ডিস্কের পার্টিকেল গুলোর নিঃসৃত রেডিয়েশন গুলোর তাপমাত্রা বিলিয়ন বিলিয়ন ডিগ্রী হয়ে থাকে। এগুলো ব্ল্যাক হোলের চারপাশে আলোর বেগে ঘুরতে থাকে এবং শেষে মিলিয়ে যায়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই বিকিরন গুলি ধরার জন্য একটি বিশেষ পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন। তারা ইন্টারফেরোমেট্রি নামের একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে টানা দুই বছর এম৮৭ এবং স্যাজিটেরিয়াসে ব্ল্যাক হোলকে পর্যবেক্ষনে রেখেছিলেন। এই পদ্ধতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ৮ টি টেলিস্কোপ রাখা হয়। টেলিস্কোপ গুলো হাওয়াই থেকে অ্যারিজোনা পর্যন্ত, মেক্সিকো থেকে স্পেন পর্যন্ত এবং চিলি থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই টেলিস্কোপগুলো থেকে সংগৃহীত রেডিয়েশন কে এমন ভাবে সংকলন করে যেন মনে হয় এটি একটি টেলিস্কোপ দ্বারাই সংগ্রহ করা হয়েছে। এই ভার্চুয়াল টেলিস্কোপটি যে চিত্র সংগ্রহ করে সেটি হচ্ছে ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজন থেকে যেসব পার্টিকেল ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন হিসেবে নির্গত হয় সেগুলোর ট্রেইস। এই দুর্বল রেডিয়েশন গুলোর অধিকাংশই হচ্ছে রেডিও ওয়েভ। টেলিস্কোপের নজরে পড়ার জন্য ওয়েভ গুলোকে কয়েক ট্রিলিয়ন কিলোমিটার অতিক্রম করে আসতে হয়েছে।
যদি আপনি ধরে নেন Spaghettification হওয়ার পরও আপনার প্রাণ আছে তবে আপনি সেখানে পৌঁছে প্রথমেই যে অবস্থার মুখোমুখি হবেন তার নাম Singularity.
Singularity বিষয়টি আসলে বর্ণনা করাই কঠিন।তাও এ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
Black Hole এমন এক রহস্যময় জগৎ যেখানে স্থান,কালও নিজের আচরণ পরিবর্তন করে ফেলে।সেখানে স্থান,কাল সব মিলেমিশে একাকার।এই জগতে ফিজিক্সের কোনো সূত্রই কাজ করে না।এসকল অবস্থাকেই মূলত Singularity বলা হয়।
একটি উদাহরণ দিচ্ছি তাহলে হয়তো বুঝতে কিছুটা সহজ হবে।
আমরা জানি,
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রটি,
“মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুকণা পরস্পরকে আকর্ষণ করে।এই আকর্ষণ বলের মান বস্তু দুটির ভরের গুনফলের সমানুপাতিক এবং এদের মধ্যকার দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।”
অর্থাৎ,
F=G×m1m2/d^2
যেখানে,
১. F হচ্ছে দুটি বস্তুকণা একে অপরকে আকর্ষণ বলের মান।
২. m1 এবং m2 হচ্ছে দুটি বস্তুকণার ভর।
৩. d বস্তুকণাদ্বয়ের মধ্যকার দূরত্ব।
৪. G মহাকর্ষীয় ধ্রুবক যার মান (6.67×10^-11Nm^2kg^-2)
Black Hole এর ক্ষেত্রে বস্তু কণাদ্বয়ের দূরত্ব d বলতে কিছু থাকে না।যার ফলে আকর্ষণ বলের মান হিসেবই করা যায় না।
ঠিক তেমনই স্পেস(স্থান) এবং টাইমের সূত্রও সেখানে কাজ করে না। সবকিছুই infinite(অসীম)হয়ে যায়।
একবার Black hole এ প্রবেশ করলে কোনোভাবেই সেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব হবে না।কারণ,এতবেশি মুক্তিবেগ অর্জন করা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়।
চলুন, কিছুক্ষণের জন্য ধরে নেওয়া যাক আপনি জীবন নিয়ে Black Hole এ পৌঁছুতে পারলেন।তাহলে কিন্তু আপনি এই মহা বিশ্বের সকল রহস্য উদঘাটন করতে পারবেন।সময় সেখানে থমকে আছে যার ফলে মহাবিশ্বের অতীত থেকে বর্তমান সবকিছুই আপনি জানতে পারবেন।এ বিষয়টিকে মূলত ইনফরমেশন প্যারাডক্সে সংঙ্গায়িত করা যায়।ইনফরমেশন প্যারাডক্সের মূল কথা কোনো তথ্যই একেবারে মুছে যায় না বরং সব তথ্যই জমা থাকে।সেটি আমরা Black Hole এর ভেতর পেতে পারি।তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আপনি সেখান থেকে কোনো তথ্যই বাহিরে পাঠাতে পারবেন না।
আপনি সব জানলেন,অনেক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলেন,কিন্তু এবার আপনার পরিণতি কী?
আপনি কিন্তু সেখানে অমরত্ব লাভ করতে পারেন।যেহেতু সময় থমকে আছে এবং স্পেস-টাইমের সূত্র Black Hole এর ক্ষেত্রে infinite বলছে!অথবা ফ্রিজড্ হয়ে যেতে পারেন আজীবনের জন্য।
হুশে ফিরিয়ে আনুন…
আপনি Spaghettification এর সময়ই ভয়ংকর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে ফেলেছেন।
কোনো কোনো বিজ্ঞানীদের ধারণা একটি Black Hole সৃষ্টির পাশাপাশি একটি White Hole এরও সৃষ্টি হয় এবং Black Hole এর শেষ হয় White Hole এর মাধ্যমে।এদের আমরা Worm Hole বলি।
এবার হোয়াইট হোল সম্পর্কে একটু ধারণা নেওয়া যাক।
ব্ল্যাকহোলের বিপরীত হলো হোয়াইট হোল।ধারণা মতে ব্ল্যাক হোল যা ধারণ করে হোয়াইট হোলের মাধ্যমে তা বাহিরে নিক্ষেপ করে থাকে।আশ্চর্য জনক তথ্য হচ্ছে এর মাধ্যমে টাইম ট্রাভেল সম্ভব।তবে হোয়াইট হোল এখনো দৃশ্যমান হয়নি এবং ধারণা করা হয় এটি এত ছোটো যে এর ভেতর স্পেসশিপ তো দূর exotic matter ছাড়া অন্য কোনো পদার্থ প্রবেশ করতে পারে না।
তবে এই exotic matter এখনো সনাক্ত করা যায়নি।
আবার এটি ছাড়া অন্যকোনো পদার্থ প্রবেশ করলে হোয়াইট হোল বিস্ফোরণও হতে পারে।এবার যদি কোনোভাবে হোয়াইট হোলের আকার বৃদ্ধি করে সেখানে আমরা অবস্থান করতে পারি তবে এর মাধ্যমে আমরা অন্য যেকোনো ইউনিভার্সেও প্রবেশ করতে পারি।এমনকি অতীত কিংবা ভবিষ্যতেও গমন করা সম্ভব হতে পারে।ওয়ার্ম হোলের মাধ্যমেও টাইম ট্রাভেল সম্ভব।ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি হয় এক ইউনিভার্সে এবং তার শেষ হয় অন্য ইউনিভার্সের হোয়াইট হোলের মাধ্যমে।যার মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করা যেতে পারে অন্য ইউনিভার্সে,অতীত,ভবিষ্যৎ কিংবা প্যারালাল ইউনিভার্সে।
ব্ল্যাক হোলে প্রাণ নিয়ে প্রবেশ করতে পারলে অনেক অভিজ্ঞতা নেওয়া যাবে ঠিক-ই তবে কোনোভাবেই আর পৃথিবীতে ফিরে আসা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।তাই একে ‘না ফেরার জায়গা’ও বলা চলে।
– রাইয়ান আজমি
-দুরন্ত প্রতিনিধি





